আমাদের ধারণা ও মনচিত্র

আমরা গণি ও গানের সংসারের সাথে পরিচিত হয়েছি। তাদের সাংসারিক কাজের বিবরণ আর জীবনযাপনের বর্ণনা থেকে আমাদের মনের মধ্যে তাদের সংসার সম্পর্কে এক রকমের ধারণা (concept) তৈরী হয়েছে। আমরা যদি অন্য কোনো কৃষক সংসারের আলোচনা শুনি, তখন আমাদের মনের মধ্যে তাদের সংসারের নামে আরেকটি ধারণা তৈরী হবে। গণি ও গানের সংসারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করলেও মনের মধ্যে আরো ধারণা তৈরী হতে থাকবে।

আমাদের চারপাশে আমরা যা কিছু দেখি তা থেকে এইভাবে আমাদের মনের মধ্যে একেকটা ধারণা তৈরী হয়। শুধু চারপাশের ধারণার প্রভাবেই নয়, আমাদের মনের ভেতরের এক-একটি ধারণার প্রভাবেও আরো অনেক-অনেক ধারণার জন্ম হতে পারে। যেমন গণি ও গানের সংসার সম্পর্কে জানার পরে আমাদের মনে এক ধরনের ভালো লাগার ধারণা তৈরী হতে পারে।

মনের ভেতরে কোন ধারণার প্রভাবে কোন ধারণাটা এলো তা যদি আমরা নকশা একেঁ দেখাই তাহলে ধারণাগুলোকে একের সাথে অপরকে জালের ন্যায় সংযুক্ত করতে হবে। স্বাভাবিক ভাবেই কারো মনের পুরো নকশা আকঁতে গেলে তা অনেক বড় ও ঘিঞ্জি হয়ে যাবে। এই রকমের নকশাকে আমরা বলবো মনচিত্র (mindmap)। এ রকম একটি মনচিত্র নিচের ছবিতে দেখো।

বিষয়গুলো আরেকটু ভিন্নভাবে বললে বলা যায় আমাদের মনের মধ্যে যা কিছু আকুলি বিকুলি করে তার সবকিছুই একেকটি ধারণা। এই ধারণাগুলির অনেকগুলো বাইরের কাঠ-পাথরের সাদা-কালো জগতের সাথে সম্পর্কিত. আবার অনেকগুলো আমাদের মনের ভেতরের আনন্দ-বেদনার রঙ-বেরঙয়ের জগতের সাথে সম্পর্কিত। বাইরের জগতের সাথে সম্পর্কিত ধারণাগুলোর উদাহরণ হলো জমি, ধান, মাড়াই করা, অথবা চাউল। আর মনের ভেতরের জগতের সাথে সম্পর্কিত হলো সুখের সংসারের সুখ বিষয়ক ধারণা অথবা স্কুলে না যেতে পারার অতৃপ্তি থেকে অতৃপ্তি বিষয়ক ধারণা।

ধারণা ও তাদের উৎপত্তির কথা জানলাম, এখন প্রশ্ন হলো মনের ভেতরে তৈরী হওয়া এই ধারণাগুলোর কাজ কী? এগুলো দিয়ে আমরা কী করবো? সোজা কথায় এর জবাব হচ্ছে আমাদের মনে যত ধরনের ধারণার সৃষ্টি হয় তার অনেকগুলো বাইরের জগৎ থেকে পাওয়া বাস্তব অভিজ্ঞতাকে মনের ভেতরে বর্ণনা করবার জন্য ব্যবহৃত হয়। আর অন্য অনেকগুলো ধারণা মনের ভেতরের মানসিক কোনো ভাবনাকে মনের ভেতরেই বর্ণনা করবার জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু মনের ভেতরে সবকিছুই যেহেতু একেকটি ধারণা, তাই আমরা বোধ হয় বলতে পারি একরকমের ধারণা স্রেফ অন্যরকমের ধারণার বর্ণনায় ব্যবহৃত হয়।

আমরা গণি ও গানের সংসার নিয়ে আলোচনাটি আবার পড়ি। মজার ব্যাপার হলো গণি ও গানের সংসার ধারণাটির আলোচনায় আমরা কিন্তু আগে থেকে জানা আরো অনেক ধারনা ব্যবহার করেছি। যেমন “গণি” ও “গান” দুজন পুরুষ-মহিলা, এই ধারণাগুলো আমাদের আগে থেকেই রয়েছে। তাদের পরিবার আবার “কৃষক পরিবার”। কৃষক পরিবার মানে তারা কৃষি কাজ করে, মানে জমিতে ফসল ফলায়। এইভাবে গণি ও গানের সংসারের বর্ণনার প্রতিটি বাক্য ও প্রতিটি শব্দ সম্পর্কে আমরা আগে থেকে আলাদা আলাদা করে জানি। আর সেই বাক্য ও শব্দগুলো আমাদের মনের মধ্যে আগে থেকেই বিদ্যমান একেকটা ধারণাকে নির্দেশ করেছে। তারপর বর্ণনার ধারাবাহিকতায় সবগুলো ধারনা একসাথে হয়ে চমৎকার ভাবে “গণি ও গানের সংসার” ধারণাটিকে বর্ণনা করেছে। তাছাড়া খেয়াল করে দেখো “গণি ও গানের সংসার” ধারনার উদাহরণটিসহ আমরা এই খানে “ধারণা” সম্পর্কে আলোচনা করার চেষ্টা করছি। কথাটি একটু পেঁচালো, কিন্তু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে কঠিন কিছু নয়।

আমরা ধারণাগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করবো। পরিচয়বোধক (identifier) ধারণা আর পরিমাণবোধক (quantifier) ধারণা। পরিচয়বোধক ধারণা আমাদের মনের মধ্যে কোনো বিষয় যেমন বস্তু বা ভাবের পরিচয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। বস্তুবাচক বিষয়গুলোর উদাহরণ হলো ধান ও গুদাম আর ভাববাচক বিষয়গুলোর উদাহরণ হলো সুখ ও অতৃপ্তি। অন্যদিকে পরিমানবোধক ধারনা কোনো কিছু কতটুকু এরকম ধারনা দিতে বুঝানো হয়, যেমন কয়েক টুকরো জমি বা পাঁচমন ধান। আসলে পরিমাণবোধক ধারণাগুলোও কিন্তু এক অর্থে পরিচয়বোধক ধারণাই, যেহেতু তাদেরও পরিচয় দরকার, না হলে মনের ভেতরে একটা থেকে আরেকটাকে আলাদা করবো কীভাবে। কিন্তু আমাদের বাস্তব জীবনে তাদের স্পষ্ট একক পরিচয় নিয়ে আমরা ততটা আগ্রহী নই।

(Visited 27 times, 1 visits today)

Leave Comments